রাসবিহারী সিংহ

আমিও আমাকেই ভালোবাসি

তুমি যেটা পছন্দ কর সেটা যখন বিপরীত ব্যক্তিও পছন্দ করে, তখন তুমি নিজের অজান্তেই বিপরীত ব্যক্তিটাকে পছন্দ করা শুরু কর। আর যদি না কর তাহলে তুমি নিজের পছন্দ গুলাকেই পছন্দ কর না। যারা বিপরীত ব্যক্তির সাথে নিজের সাম্যতার কারণে বিপরীত ব্যক্তিকে পছন্দ করে, তারা আসলে নিজেকেই বেশি পছন্দ করে। তারা জন্মগত হোক বা পরিবেশগতই হোক, কোনো না কোনোভাবে প্রচণ্ড রকমের স্বার্থপর হয়। কেননা তারা নিজের জন্যই খুব বেশি চিন্তা করে। এই পৃথিবীতে সবাই স্বার্থপর, পৃথিবীতে কেউই স্বার্থহীন হয়ে জন্মায় না। যদি কেউ এসে বলে যে আমি স্বার্থপর না। তাহলে তাঁর কাছে আমার একটাই প্রশ্ন থাকবে, তুমি স্বার্থপর না হলে বেঁচে থাকার জন্য খাবার খাও কেন? যে খাবার গুলো খাচ্ছো, সেগুলোও তো পৃথিবীতে তোমারই স্বার্থ। খেতে হলে নিজের শরীরের অংশ কেটে খাও না কেন? মানলাম নিজের শরীর কেটে খাবে। কিন্তু এই শরীর তো তোমার মা বাবার দেওয়া। এই শরীর টাও তো তোমার নয়। তাহলে জন্মেছই বা কেন? তোমার বাবা মা চেয়েছেন বলেই তুমি জন্মেছ। তাঁর মানে উনারাও নিজের চাওয়াকে পূরণ করার জন্যই তোমাকে জীবন দিয়েছেন। আরো গভীরে চিন্তা করলে দেখা যাবে এই চক্র টা মানুষের সৃষ্টির শুরু থেকেই চলছে। শুধু মানুষেরই যে এই স্বার্থ আছে তা না। এটা অন্য জীবদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাহলে নিজেকে স্বার্থপর স্বীকার করতে তোমার মুখ কাঁপে কেন?। এই প্রশ্নটা করলে মানুষ আমাকে পাগল ছাড়া কিছুই ভাববে না। সবাই স্বার্থপর কথাটা সত্য। তবে স্বার্থপরতার গাঢ়ত্বের মাধ্যমে পৃথিবীর মানব সমাজ স্বার্থপর শব্দটাকে ব্যবহার করে। পৃথিবীর জনসাধারণের সাপেক্ষে, কোনো মানুষ যদি আরেকটা মানুষের পছন্দের জিনিস কেড়ে নেয় বা ক্ষতি করে দেয়। তবে ওই ভিক্টিমের কাছেই মানুষটা স্বার্থপর। বাকিদের কাছে ওই মানুষটা স্বার্থপর কি না সেটা আপেক্ষিক বিষয়। তাই আমরা কেউই এই স্বার্থপরতাকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারবো না। আর যদি কেউ করেও তাহলে ওই ব্যক্তিকে কোন এক কার্যকলাপকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরে প্রথমে স্বার্থপরতাকে মাপতে হবে। তারপরে এই স্বার্থপরতাকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। একই সাথে ওই স্বার্থপরতাটা কোন কার্যকলাপকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরে মাপা হয়েছে সেটাও বলে দিতে হবে। নাহলে ওই ব্যক্তিকে যুক্তিহীন সংজ্ঞাদাতা হিসেবে গণ্য করা হবে। এখন আসি যারা নিজের পছন্দকেই পছন্দ করে না তাদের স্বার্থ নিয়ে। উপরে যা যা প্রশ্ন উল্লেখ করেছিলাম তা বিবেচনা করলে এই ধরণের ব্যক্তিগুলাও স্বার্থপর। তবে হয়তো জন সম্মুখে না, হয়তো তারা গোপনে অন্য কোন এক বিষয়ে বা কার্যকলাপে নিজের স্বার্থপরতা প্রদর্শন করে। সুতরাং, এই পৃথিবীতে কেউই স্বার্থহীন না। উপরে একটা কথা লিখেছিলাম, যারা বিপরীত ব্যক্তির সাথে নিজের সাম্যতার কারণে বিপরীত ব্যক্তিকে পছন্দ করে। এই কথাটাকে আরেকটু খুঁটিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, যখন আমরা নিজের কোনো ব্যাপার পছন্দ করি আর ঠিক একই ব্যাপারটা আরেকজনও পছন্দ করে এবং সে এসে আমাদেরকে বিষয়টা জানায়। তখন আমাদের ভিতরে বিপরীত ব্যক্তিটির প্রতি প্রচন্ড রকমের ভালোলাগা কাজ করে। কারণ সে আমার নিজের পছন্দের দিকটাকে পছন্দ করেছে। অর্থাৎ, তাঁর পছন্দ আর আমার পছন্দ একই। সুতরাং ঘুরে-ফিরে ব্যাপারটা এইটাই যে, আমার পছন্দ করা জিনিসটা অপর পক্ষেরও পছন্দ হয়েছে বলে আমি সেই ব্যক্তিতে নিজেকেই অন্য এক রূপে দেখছি এবং পছন্দ করা শুরু করছি। কারণ মানুষ নিজেকেই ভালোবাসে। ঠিক তেমনই আমাদের পিতামাতারাও আমাদের মাঝে নিজেদেরকে দেখতে পান। এখন একদল মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কারোর সন্তান তো তাদের থেকেই উৎপত্তি। তাই মা বাবা এবং সন্তান সমান হওয়াটা সবারই জানা কথা। এটা সবাই জানে এবং আমিও জানি যে এটা জানানোর কোন দরকার ছিল না। তবে মা বাবার আমাদেরকে আপন ভাবা এবং আমাদেরকে ভালোবাসার কারণটা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি নিজের তৈরি এই বিদঘুটে তত্ত্ব দিয়ে। তাই অনেকের কাছে এটা ভুল মনে হতেও পারে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ সবার দৃষ্টিভঙ্গি সমান না। আমি যেটাকে ইংরেজি সংখ্যা নয় দেখছি সেটাকে আপনি হয়তো ছয়ও দেখতে পারেন। এইজন্য সবার মতামতকেই সম্মান দেওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। কথাগুলোর সার-সংক্ষেপ হলো, এই জগতের সবাই নিজেকে বৈ কাউকে ভালোবাসে না।

লেখক

শিক্ষার্থী, সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ।

৫টি মন্তব্য

  1. আমার লেখাটা পাবলিশ করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

  2. চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সম্পর্কটা পারস্পরিক সান্নিধ্যের কারণেই গাঢ় হয় না, প্রয়োজন ত্যাগের আলোয় নিজেকে মেলে ধরা। ছাড় দিয়েই বন্ধুত্বকে টিকিয়ে রাখা।

    1. শ্রদ্ধা, দোয়া চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।