সুমাইয়া জান্নাত প্রেমা: আমরা এখন বেশিরভাগ মানুষই দুনিয়ার মায়ায় আসক্ত। আমরা যেন এই দুনিয়া থেকে যেতে চাই না। আমরা এই দুনিয়ায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকতে চাই। আমাদের কাছে এখন দুনিয়াই সব। দিন দিন যাচ্ছে, আর আমরা দুনিয়ার মায়ায় প্রবলভাবে আকৃষ্ট হচ্ছি। দুনিয়াকে যেন আমরা ছাড়তে চাই না। আর এই দুনিয়ার মায়ায় পড়েই আমরা আস্তে আস্তে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমরা ভুলে গেছি ইসলামকে, ভুলে গেছি আল্লাহকে। আর এ কারণেই আমরা এখন সব ধরনের পাপ কাজ করতে পারছি।

আমরা এখন আমাদের জীবিকা অর্জনে হালাল-হারাম বিবেচনা করি না। আমরা এখন আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলাটাকেই গর্বের মনে করি। কিন্তু এই আধুনিক যুগ যে কতভাবে আমাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, তা আমরা ভাবতেও পারি না।

আমাদের সকলেরই এখন ইচ্ছা একটাই। আমরা চাই কীভাবে অনেক টাকার মালিক হওয়া যায় এবং কীভাবে এই দুনিয়ায় ক্ষমতার আসনে বসা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সকল ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমরা কী না করছি, তা নিয়ে আমাদের নিজেদেরই কোনো ধারণা নেই।

দুনিয়া নিয়ে আমরা এখন এতটাই ব্যস্ত যে মৃত্যুর কথা চিন্তা করার কোনো সময়ই পাই না। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত চিন্তা করি, কিন্তু মৃত্যুই হলো আমাদের চূড়ান্ত এবং নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দুনিয়ার প্রতি মায়া আমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত করা থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। আমাদের মাথায় এখন শুধু দুনিয়া, আর দুনিয়ার চিন্তাতেই কাজ করি। এর বাইরে আর কিছুই না।

দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমরা এখন বড় বড় দালান-কোঠা, অট্টালিকা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আমরা এখন এত বিলাসবহুল জীবনযাপন করছি যে, সেই টাকায় অনেকগুলো গরিব পরিবারের সংসার চালানো সম্ভব হতো। আমরা এই দুনিয়ায় এখন প্রায় সব বিষয় নিয়েই প্রতিযোগিতায় নেমেছি। কে কার থেকে কোন দিক দিয়ে উপরে উঠতে পারবে, আমরা সবসময় সেই চিন্তাতেই থাকি।

আর আমাদের উপরে উঠতে যাওয়ার পথে কে কষ্ট পেল, কে আঘাত পেল, সেটা আমরা দেখার প্রয়োজন মনে করি না। দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমাদের মধ্যে থাকা মানবতা কেমন জানি হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষের জন্য—এই কথাটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু আগেকার দিনে যেমন একজনের বিপদে আরেকজন এগিয়ে আসত, এখন তা তেমন দেখা যায় না। এখন একজনের জীবনে বিপদ এলে আরেকজন দূর থেকে মজা নেয়।

মানুষের মধ্যে থাকা মনুষ্যত্ব কেমন জানি হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ কেমন জানি মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশু হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার আধুনিক যুগ। এটি মানুষের জীবনে প্রবল প্রভাব ফেলেছে। এই আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদেরকে ঈমান হারাতেই হবে। এই আধুনিক যুগ আমাদের মেয়েদের সমান অধিকারের কথা বলে সবার সামনে আমাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করছে। আর আমরাও মেনে বসে আছি যে আমরা সমান অধিকার ভোগ করছি।

আসলে এভাবে আমরা সমান অধিকার ভোগ করছি না। এভাবে আমরা আমাদের সম্মান হারাচ্ছি। ইসলাম আমাদের মেয়েদের সমান অধিকার দিয়েছে। ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে—কখনো মা হিসাবে, কখনো মেয়ে হিসাবে, কখনো বোন হিসাবে, আবার কখনো স্ত্রী হিসাবে। আর এই ইসলাম ছাড়া জীবন বৃথা।

আমরা এখন সেই ইসলামকে ভুলে গেছি দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে। আমরা বারবার ভুলে যাই যে এই দুনিয়া ফল ভোগের জায়গা নয়। এই দুনিয়া হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। এখানে আমরা যেমন পরীক্ষা দেব, আখিরাতে তেমনই ফল ভোগ করব। অথচ আমরা দুনিয়াতে পরীক্ষা দিতে এসে পরীক্ষার খাতাই হারিয়ে ফেলেছি। আমরা মিশে গেছি এক বর্বর পরিবেশের সাথে। যে পরিবেশ একেবারেই শান্তিপূর্ণ নয়।

যে পরিবেশ মানুষকে সব ধরনের পাপ কাজ করতে উৎসাহিত করে, যে পরিবেশ মানুষকে মানুষ থেকে পশু বানিয়ে দেয়, যে পরিবেশ মানুষের থেকে মনুষ্যত্ব কেড়ে নেয়, আমরা তেমনই এক পরিবেশের সাথে মানানসই হয়ে বসবাস করছি।

আমরা দুনিয়ার মায়ায় এখন এমনভাবে আবদ্ধ যে আমাদের চোখের উপর, মনের উপর পর্দা পড়েছে। তাই আমরা এখন উপলব্ধি করতে পারি না কোন কাজটা ভালো, কোন কাজটা খারাপ। আমরা এখন নিজেরা যা বলি, তাই সত্যি। অন্যের মতামতের কোনো দাম নেই। আমরা এখন কুরআন-হাদিস মেনে চলার কথা মনেই আনি না। আমরা এখন ইসলামিক আইন মেনে চলার কোনো কারণই খুঁজে পাই না।

আমরা এখন নিজেরাই বিভিন্ন ধরনের আইন-কানুন তৈরি করছি। এসব আইনের সবগুলোই হলো আমাদের নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক।

এই দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমরা কত কিছুই না করি। কীভাবে আরও ধন-সম্পদের মালিক হবো, কীভাবে নিজের জন্যে, নিজের সন্তানের জন্য একটা সুন্দর বাড়ি তৈরি করব, এরকম আরও কত কিছুই করছি। কিন্তু একবারও কি এটা চিন্তা করে দেখেছি যে, এই দুনিয়ায় কি আমরা চিরদিন থাকতে পারব?

আর যেহেতু আমরা এই দুনিয়ায় চিরস্থায়ী নই, তাহলে কেন আমাদের দুনিয়ার প্রতি এত মায়া? কেন আমাদের দুনিয়া নিয়ে এত চিন্তা? কেন আমরা দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই?

আর আমরা বারবার ভুলে যাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই দুনিয়াতে তাঁর ইবাদত করার জন্য পাঠিয়েছেন, কোনো রং-তামাশা করার জন্য নয়। কিন্তু আমরা তো দুনিয়ার মায়ায় পড়ে সেই আল্লাহকেই ভুলে গেছি। আমরা এখন আমাদের যা মনে চায়, তাই করছি।

কিন্তু আমরা ঠিক কী করছি, সেটা আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা এখন যে পথে চলছি, সে পথ কখনোই আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। এই পথ আমাদের জন্য বয়ে আনবে অশান্তি।

আমরা এখন দুনিয়ার মায়ায় পড়ে যা খুশি তাই করতে পারছি। হালাল-হারাম সব খেতে পারছি, অন্যায়ভাবে মানুষের উপর জুলুম করতে পারছি, অন্যের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক নিজের করে নিতে পারছি, অনেক টাকা-পয়সার মালিক হতে পারছি। কিন্তু আমরা যেটা পারছি না, তা হলো মানসিক শান্তি আনতে। আমরা কোনোভাবেই মানসিক শান্তি পাচ্ছি না।

কারণ মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে কেউ কখনো সুখী হতে পারে না। অন্যের মনে কষ্ট দিয়ে, অন্যের ধন-সম্পদ লুট করে সেগুলো ভোগ করে কখনো শান্তি পাওয়া যায় না। মনে রাখবেন, যাকে আপনি কষ্ট দিয়েছেন, সেও সেই রবেরই সৃষ্টি যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিকর্তা কারো একার নয়। সৃষ্টিকর্তা সবার।

আমরা যদি মনে করি, অন্যের মনে কষ্ট দিয়ে, অন্যকে ছোট করে, অন্যকে অসম্মানিত করে, অন্যকে অপমানিত করে নিজে মহৎ হয়ে যাবো, নিজে বড় হয়ে যাবো, তাহলে সেটা নিতান্তই ভুল।

ধরুন, আমি একজন মানুষকে এতোটাই কষ্ট দিয়ে ফেললাম যে সে সামনে ভাত নিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছে। এখন কী ভাবছেন, ভাতের দানাগুলো কখনোই আমাকে ক্ষমা করবে? কখনোই না।

আবার ধরুন, আমি কারো মনে এতোটাই কষ্ট দিয়ে ফেললাম যে সে সিজদাহে গিয়ে কেঁদে দিলো। এখন সেই চোখের পানিগুলো কখনোই কি আমাকে ক্ষমা করবে? কখনোই না। কারণ, সৃষ্টিকর্তা তারও যাকে আমি কষ্ট দিয়েছি। সুতরাং আমি ছাড় পাবো না।

আর এই দুনিয়া তো দুই দিনের। দুই দিনের দুনিয়াতে আমাদের সখের কোনো শেষ নেই। আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের সখের কোনো শেষ হবেও না। একদিন হঠাৎ করেই আমাদের প্রাণপাখি উড়ে যাবে, কিন্তু সখ ঠিকই থেকে যাবে।

আর আমরা আমাদের এসব সখ পূরণ করার জন্যই সব ধরনের পাপ কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কথা হলো এমন, আমাদের সকল সখ পূরণ করবই। হোক সেটা অন্যায় কাজ করে, হোক সেটা পাপ কাজ করে, হোক সেটা মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে। কিন্তু যে কাজ করে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় না, যে কাজ করে জীবনে অশান্তি বয়ে আনতে হয়, যে কাজ পরকালে শাস্তির অপেক্ষা করায়, সেই কাজ করে কী লাভ?

এই দুনিয়া আমাদেরকে যে দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার পুরোটাই আমাদের জন্য অকল্যাণকর। দুনিয়ার মায়া আমাদেরকে করে তুলেছে স্বার্থপর। তাই আমরা সবকিছু নিজেরাই ভোগ করতে চাই, অন্যকে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

এই দুনিয়ার মায়ায় পড়ে আমরা ভুলে গেছি যে, প্রতিটি মুসলমান ভাই-ভাই। তাই আমরা এখন কারো বিপদে এগিয়ে আসি না। বরং চেষ্টা করি কিভাবে তাদেরকে আরও বিপদে ফেলা যায়, কীভাবে তাদের মধ্যে ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি করা যায়। আমরা এখন এক ভাইয়ের ক্ষতি আরেক ভাই করছি অনায়াসে।

আর এতে আমাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হয় না যে, সে তো আমারই ভাই। আমি কেন তার ক্ষতি করার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছি? আমি কেন তাদের মনে অশান্তির সৃষ্টি করছি?

আর এই দুনিয়ার মায়া তো আমাদেরকে ঠিক ইসলামের উল্টো দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইসলাম যেখানে আমাদেরকে সত্য কথা বলতে শেখায়, এই দুনিয়া সেখানে আমাদেরকে মিথ্যা কথা বলতে শেখায়।

এই দুনিয়া তাদেরকেই সঙ্গ দেয় যারা মিথ্যা কথা বলতে পারে। আর যারা সত্য কথা বলে, তারা শিকার হয় নির্মম অত্যাচারের। ইসলাম যেখানে আমাদেরকে আল্লাহর দাসত্ব করতে শেখায়, সেখানে এই দুনিয়া আমাদেরকে শয়তানের দাসত্ব করতে শেখায়।

দুনিয়া আমাদেরকে উদ্দেশ্যহীন করে তোলে। দুনিয়ার মায়া আমাদেরকে উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে শেখায়। আমাদের জীবনে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে চলার সুযোগ দেয় না।

আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা, যাতে আমরা আখিরাতে জান্নাতে যেতে পারি। দুনিয়ার মায়া আমাদেরকে সেই উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে আনে।

দুনিয়া আমাদেরকে বোঝায়, যা করার কর, যা ভোগ করার কর। এখনও হাতে অনেক সময় আছে, আল্লাহর ইবাদত পরে করা যাবে। কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখুন, আমাদের মতোই অনেক মানুষ আজ এই দুনিয়ায় নেই। তারা আমাদের মতো বলত, তাদের হাতে অনেক সময় আছে, পরে তারা আল্লাহর ইবাদত করে নেবেন, তওবা করে সকল পাপ ক্ষমা করিয়ে নেবেন।

কিন্তু দেখুন, আল্লাহর ইবাদত করার মতো সময় তাদের জীবনে আসেনি। তার আগেই তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।

সুতরাং আমাদের জীবনেও এমন কিছু হতে পারে। হতে পারে, আমরাও পরে পরে করতে করতে আর কখনোই আল্লাহর ইবাদত করতে পারব না। তাই আমাদেরকে এখনই আল্লাহর পথে ফিরে আসতে হবে।

শয়তানের ধোঁকায় পড়ে দুনিয়ার মায়ায় পড়লে হবে না। এই দুনিয়ার মায়ায় পড়লে কেউ ইসলামের ভেতরে থাকতে পারে না। এই দুনিয়ার মায়া আমাদেরকে স্বার্থপর করে তোলে। যে এই দুনিয়ার মায়ায় পড়বে, তার জীবনই শেষ।

লেখক, 

শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *