শূন্য

রেজাউল করিম রোমেল

রাতুল মিথিলা ও সাঈদ ক্লাস সেভেনে পড়ে। তিনজনই ক্লাসের সেরা। এক দুই তিন রোল তাদের মধ্যে থেকেই হয়। পড়াশোনা, খেলাধুলা, সাধারণ জ্ঞানে তাদের সাথে কেউ পারে না। তিনজনের ভিতরে সবসময় কমপিটিশন চলে, পড়াশোনায় কে কত ভাল রেজাল্ট করতে পারে। খেলাধুলা ও সাধারণ জ্ঞানে কে কার চেয়ে ভাল করতে পারে। তবে তাদের মধ্যে কমপিটিশন থাকলেও তারা খুব ভাল বন্ধু যেন একজন আর একজনকে ছাড়া বাঁচে না।

একদিন অংক ক্লাসে মহিউদ্দিন স্যার সবাই-কে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন,

-বলো তো শূন্য অর্থ কি?

সবাই বললো,

-শূন্য মানে আবার কি-ই-বা হবে। শূন্য মানে কিছুই না অর্থাৎ যার কোনো অস্তিত্ব নেই।

আবার কোনো কোনো ছাত্রছাত্রী বললো,

-শূন্য-র আবার কোনো মানে আছে নাকি?

মহিউদ্দিন স্যার রাতুল এবং সাঈদ-কেও জিজ্ঞেস করলেন,

-রাতুল এবং সাঈদ তোমরা বলো শূন্য বলতে তোমারা কি বোঝ?

মিথিলাকেও মহিউদ্দিন স্যার একই প্রশ্ন করলেন। মিথিলা বললো,

-স্যার আমি বুঝতে পেরেছি শূন্য শব্দের একটি বিশেষ কোনো অর্থ আছে। যার অর্থ আমি এখন বলতে পারছি না। তবে আমাকে একদিন সময় দিলে শূন্য-র অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারি।

-ঠিক আছে। আজকে যেহেতু বৃহস্পতিবার। তাহলে তোমরা রবিবারে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে আনবে।

রাতুল এবং সাঈদ-ও একই কথা বললো। তারা মিথিলার সাথে একমত পোষণ করলো।

স্কুল ছুটির পর রাতুল সাঈদ ও মিথিলা একসাথে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হল। এবং তিনজন মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল যে শূন্য-র অর্থ তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তাই এখন তাদের প্রথম কাজ হবে বিভিন্ন বই পুস্তক ও ইন্টরনেট ঘেটে এর অর্থ কি হবে তা জানার চেষ্টা করা। এবং কে কি তথ্য পেল সেটা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট কোচিং করার পর একে অপরকে জানাবে।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর তিন জনই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু করল। কিন্তু মহিউদ্দিন স্যারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মত তেমন কোনো তথ্য পাওয়া গেল না।

স্টেডিয়ামে ক্রিকেট কোচিং শেষ করার পর রাতুল সাইদ ও মিথিলা এক সাথে মিলিত হল। কেউ-ই কোনো উত্তর খঁজে পাইনি বলে জানাল। কিন্তু তারা হার মানতে রাজি নয়। তাই তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিল যে বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন যারা আছে তাদের কাছে শূন্য শব্দের অর্থ জানার চেষ্টা করবে। তারা যে মতামত প্রকাশ করবে তার উপর ভিত্তি করে এবং ইন্টারনেট ও বিভিন্ন বই পুস্তক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা নিজেরা একটি উত্তর তৈরী করবে। সেই উত্তরটি মহিউদ্দিন স্যারের কাছে উপস্থাপন করবে।

আবারও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু করলো মিথিলা সাঈদ ও রাতুল। শুক্রবারে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসের পড়া শেষ করে ইন্টারনেটে বসে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করলো। এখন পরবর্তী কাজ হল বাড়িতে যারা আছে তাদের কাছে শূন্য শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করা। রাতুল প্রথমে জিজ্ঞেস করলো তার বড় ভায়ের কাছে।

-ভাইয়া বলতো শূন্য অর্থ কি?

ভাইয়া বললো,

-শূন্য! কেন, শূন্য অর্থ দিয়ে তুই কি করবি?

-মহিউদ্দিন স্যার আমাদের শূন্য শব্দের অর্থ খঁজে বের করতে বলেছে।

-ও আচ্ছা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বড় ভাই বললো,

-এসব ছোট খাটো প্রশ্নের উত্তর তুই আমার কাছে জানতে চাইবি না। কারণ এসব সহজ ও ছোট খাটো প্রশ্নের উত্তর আমার দিতে ভাললাগে না। জটিল বিষয় গুলোর উত্তর দিতে আমার ভালোলাগে। তারপরও তুই যখন জানতে চাচ্ছিস তাই বলছি। শোন শূন্য একটি ইংরেজী। যার শব্দ হল জিরো। জিরো অর্থ শূন্য এবং শূন্য অর্থ জিরো। বোঝা গেল? এই সামান্য বিষয়টি তুই পারিস না?

কথাগুলো বলে হাতের আঙ্গলে চাবির রিং ভরে দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে চলে গেল। রাতুলের বড় ভায়ের নাম রাহাত। সে এবার এস এস সি পরীক্ষা দেবে। কিন্তু সে রাতুলের সামনে এসে এমন একটা ভাব দেখায় যেন সব কিছুই তার জানা। তার কাছে অজানা বলে কিছু নেই।

রাতুল কোনো কথা না বলে সোজা চলে গেল মামার ঘরে এবং ঘরে গিয়ে দেখল মামা চেয়ারে বসে টিভি দেখছে। মামাকে সালাম দিয়ে মামার সাথে টিভি দেখতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর রাতুল তার মামাকে জিজ্ঞেস করলে,

-আচ্ছা মামা শূন্য বলতে আপনি কি বোঝেন?

-শূন্য! এর আবার কোনো অর্থ আছে নাকি?

তারপর রেগে গিয়ে বললেন,

-ফাজলামি করছিস আমার সাথে? এমনিতে তোর মামি তিন দিন ধরে বাড়িতে নেই । কে রান্না করবে,কে ঘর দেখাশোনা করবে সেই চিন্তায় অস্থির আর তুই আমার সাথে ফাজলামি করতে এসেছিস? তুই আমাকে রাগাতে এসেছিস?

রাতুল কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি মামার ঘর থেকে বেরিয়ে ঐশীর ঘরে চলে গেল। ঐশী মামার একমাত্র ছোট মেয়ে। ক্লাস টু-তে পড়ে। ঐশীর কাছে রাতুল জিজ্ঞেস করল,

-ঐশী বলতো শূন্য কি?

ঐশী কাগজের উপরে বড় একটা গোল এঁকে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।

এদিকে মিথিলা তার মা-বাবার কাছে শূন্য বলতে কি বোঝ এটি জানতে চায়লে তাঁরা কিছুক্ষণ হাসতে থাকল। তারপর বললো,

-শূন্য শব্দের অর্থ দিয়ে তুমি কি করবে?

-মহিউদ্দিন স্যার আমাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু আমরা কেউই এর উত্তর দিতে পারিনি। আমরা এর উত্তর খুঁজে বের করার জন্য সময় চেয়েছিলাম। স্যার আমাদের দুইদিন সময় দিয়েছে। আগামী রবিবারে শূন্য শব্দের অর্থ আমাদেরকে জানাতে হবে।

বাবা-মা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বাবা বললো,

-মনে করো এই ঘরে যখন খাট, চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশন কিছুই ছিল না তখন ঘরটি শূন্য ছিল। এখন সবই আছে। আবার যখন এই ঘরে কিছুই থাকবে না তখন ঘরটি শূন্য হয়ে যাবে।

মা বললো,

-তুমি হলে আমাদের একমাত্র সন্তান। যখন তোমার জন্ম হয়নি তখন আমাদের কোনো সন্তান ছিল না। তখন আমাদের ঘর শূন্য ছিল। কিন্তু যখন তোমার জন্ম হল তখন আমাদের ঘর আর শূন্য থাকল না। বুঝতে পেরেছ?

-হ্যাঁ মা; আমি বুঝতে পেরেছি।

সাইদ তার খালাত ভায়ের কাছে শূন্য শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করলে সে বললো,

-মহাবিশ্বে যখন কোনো কিছুই সৃষ্টি হয়নি তখন মহাবিশ্ব ছিল শূন্য এবং এক সময় সৃষ্টি হল গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, উদ্ভিত, প্রাণী ইত্যাদি অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রথম অবস্থায় শূন্য ছিল।

সারাদিন বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রাতে বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল মিথিলা, রাতুল ও সাঈদ। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি গুছিয়ে স্কুলে গিয়ে তিনজন একসাথে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা করল। তারপর মহিউদ্দিন স্যার ক্লাসে এসেই মিথিলা, রাতুল ও সাঈদ-কে বললেন,

-শূন্য শব্দের অর্থ বের করার জন্য তোমরা আমার কাছে একদিনের সময় চেয়েছিলে। এখন বলো কে কি উত্তর এনেছ।

মিথিলা বললো,

-একটি ঘরে যখন কোনো কিছুই থাকে না তখন ঘরটি শূন্য থাকে। কিন্তু যখন চেয়ার টেবিল ইত্যাদি জিনিসপত্র ঘরটিতে রাখা হয় তখন সেটি আর শূন্য থাকে না। আবার চেয়ার টেবিল ইত্যাদি জিনিস সরিয়ে নিলে ঘরটি আবার শূন্য হয়ে যায়।

রাতুল বললো,

-কোনো একটি স্থানে একটি বস্তু ছিল কিন্তু যখন বস্তুটি সে জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়া হয় তখন সে স্থান শূন্য হয়।

সাঈদ বললো,

-মহাবিশ্বে এক সময় কোনো কিছুই ছিল না। তখন মহাবিশ্ব ছিল শূন্য কিন্তু যখন গ্রহ, উপগ্রহ, মানুষ, উদ্ভিত, প্রাণী ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে। এখন মহাবিশ্বকে শূন্য বলা যায় না।

মহিউদ্দিন স্যার বললেন,

-তোমরা যে উত্তর দিয়েছ তা ঠিক আছে। এতে কোনো ভুল নেই। তবে ভালভাবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি তোমরা আরো সহজে বুঝতে পারবে। যেমন গাণিতিক সংখ্যা শুরু হয় শূন্য থেকে। শূন্য এক দুই তিন চার … । আবার দ্যাখ এখানে একটি সাদা কাগজ আছে। এখানে কিছু লেখা নেই। এখন কাগজটি শূন্য। কিন্তু যখন কাগজটিতে কিছু লেখা হবে তখন সেটি আর শূন্য থাকবে না। অর্থাৎ সঠিক উত্তরটি হল শূন্য থেকে শুরু।

বিষয়টি সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে মহিউদ্দিন স্যার ক্লাসের পড়া পড়াতে শুরু করল। রাতুল মিথিলা ও সাঈদ অনেক খুশি হল কারণ বিষয়টি সম্বদ্ধে তারা যে তথ্য সংগ্রহ করেছিল তা সঠিক ছিল এবং শূন্য শব্দের সঠিক উত্তর তারা জানতে পারল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।